মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০১৫

জিহাদের সার্বিক তাৎপর্য ড. কারজাবির বক্তব্য-শাহ্ আব্দুল হান্নান







ড. ইউসুফ আল কারজাবির শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর একটি হচ্ছে ‘ফিকহুজ জিহাদ’ বা ‘জিহাদের বিধান’। এটি এখনো ইংরেজি বা বাংলায় অনূদিত হয়নি। তবে বইয়ের সারসংক্ষেপ ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। এ গ্রন্থের ওপর আরেকজন বড় ইসলামি চিন্তাবিদ তিউনিসিয়ার ড. রশদি আল ঘানুসি ২০০৯ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করেন। এটিও ইন্টারনেটে পাওয়া যায় (ঝযড়হপযধৎড়হ.পড়স দেখুন)। এ প্রবন্ধ থেকেই আমি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নিচে তুলে ধরছি।
ড. কারজাবি জিহাদ সম্পর্কে গবেষণা করতে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেন তা নি¤œরূপÑ
১. কুরআন ও সম্পূর্ণভাবে নির্ভুল সুন্নাহর ওপর নির্ভর করা। দুর্বল কোনো প্রমাণ গ্রহণ না করা।
২. ইসলামের ব্যাপক ফিকাহ সাহিত্যের সাহায্য গ্রহণ করা। কোনো বিশেষ মাজহাবের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করা। তারপর সবচেয়ে উপযুক্ত মত গ্রহণ।
৩. ইসলামের সাথে অন্যান্য ধর্মের এবং আইনব্যবস্থার তুলনামূলক অধ্যয়ন করা।
৪. দাওয়া, শিক্ষাদান, রিসার্চ, ফতোয়া, সংস্কার ও পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে ‘ওয়াসতিয়া’ বা মধ্যপন্থা গ্রহণ করা। আজকের সমস্যার সমাধানে ইজতিহাদকে ব্যবহার করা; যেমনÑ পূর্বকালে সে যুগের ফকিহরা তাদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে করেছিলেন।
জিহাদের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, জিহাদ ও কিতাল (যুদ্ধ)-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মক্কাতেই জিহাদের আয়াত নাজিল হয়। কিন্তু তখন কিতাল ছিল না। তখন জিহাদ ছিল দাওয়ার। ড. কারজাবি ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইবনুল কাইয়িমকে উল্লেখ করে বলেন, কিতাল ছাড়াও জিহাদের ১৩টি পর্যায় রয়েছে। জিহাদ বিল নাফসের চারটি পর্যায়, শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদের দুটি পর্যায়, মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের চারটি পর্যায় এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে জিহাদের তিনটি পর্যায় (হাত দ্বারা, মুখ দ্বারা এবং অন্তর দ্বারা) রয়েছে।
ড. কারজাবি আধুনিককালে পার্টি, পার্লামেন্ট, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে অত্যাচার বন্ধ করার প্রচেষ্টাকেও জিহাদ বলছেন। তিনি নানা পদ্ধতিতে সাংস্কৃতিক জিহাদের কথাও বলেছেন (ইসলামি সেন্টার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি)।
জিহাদের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ইসলাম আত্মরক্ষামূলক জিহাদের কথা বলেছে। যদিও পূর্বে আক্রমণাত্মক জিহাদের পক্ষেও অনেকে বলেছেন। তিনি মনে করেন, আমাদের পূর্বের ফকিহরা যে আক্রমণাত্মক জিহাদের কথা বলেছেন, তার ভিত্তি কুরআন বা সুন্নাহ নয় বরং তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা। তখন সব রাষ্ট্র পরস্পর সঙ্ঘাতে লিপ্ত ছিল। কোনো সর্বস্বীকৃত আন্তর্জাতিক আইন ছিল না।
তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেনÑ ১. সূরা তাওবায় মুশরিকদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে, তা সাধারণ আদেশ ছিল না। সেটা ছিল আরব মুশরিকদের একটি দলের বিরুদ্ধে।
২. সামরিক জিহাদ সালাত ও সিয়ামের মতো সবার ওপর ব্যক্তিগত ফরজ নয়। ব্যক্তিগত জিহাদের কথা সূরা বাকারা, সূরা আনফাল, সূরা মুমিনুল, সূরা রাদ, সূরা লুকমান, সূরা ফুরকান বা সূরা জরিয়াতে মুত্তাকিদের গুণাবলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
৩. যদি মুসলিমরা নিরাপদ থাকে তাহলে অমুসলিম রাষ্ট্রকে আক্রমণ করা বৈধ নয়।
৪. ইসলাম ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা স্বীকার করে।
৫. ইসলাম আন্তর্জাতিক আইনের প্রণয়ন, জাতিসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানায়। মুসিলমরা আন্তর্জাতিক আইন স্বীকার করে নেয়ায় এখন অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর হামলার কোনো বৈধতা নেই।
ড: কারজাবি বলেন, বর্তমান অমুসলিম বিশ্বকে দারুল আহাদ (চুক্তিবদ্ধ দেশ) মনে করতে হবে। কেননা সব দেশই এখন জাতিসঙ্ঘের আওতায় নানা চুক্তিতে আবদ্ধ।
ড. কারজাবি আরো বলেন, ইরহাব বা সন্ত্রাস আর জিহাদ এক নয়। সব ধরনের সন্ত্রাস ইসলামে নিষিদ্ধ। এর ব্যতিক্রম শুধু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা এ ধরনের স্বাধীনতা সংগ্রাম।
এরপর তিনি ইসলামে জিহাদ বা যুদ্ধে যেসব নৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে তার আলোচনা করেন।
১. যুদ্ধে অবৈধভাবে শত্রুকে প্রলোভিত করার জন্য অবৈধ পন্থা; যেমন মদ বা যৌনতা (ঝবী) ব্যবহার করা যাবে না।
২. প্রথমে আক্রমণ করা যাবে না; যেমনÑ কুরআনের ২:১৯০ আয়াতে বলা হয়েছে।
৩. চুক্তি রক্ষা করতে হবে।
৪. দালান-কোঠা নষ্ট করা এবং গাছ ও ফসল কাটা যাবে না।
৫. আণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ; কেননা এতে যারা যোদ্ধা নন তারাও নিহত হন।
আশা করি, বর্তমান প্রেক্ষিতে জিহাদের বিভিন্ন দিক এ লেখায় সুস্পষ্ট হয়েছে।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন