মাকাসিদ আল শরিয়াহর অর্থ ইসলামি আইনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য। বর্তমান কালের
ইসলামি আইনবিশেষজ্ঞরা (উসুলিয়ুন) মনে করেন যে, আইন প্রণয়নে মাকাসিদ আল
শরিয়াহর বড় ভূমিকা থাকতে হবে।
শুরুর দিকে ইসলামি আইন প্রণয়ন বিজ্ঞানে (উসুলুল ফিকাহতে) মাকাসিদের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো ছিল না। আল জু আইসি এবং ইমাম গাজ্জালী উসুলুল ফিকাহয় মাকাসিদ আল শরিয়াহকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। আল জু আইসি প্রথমবারের মতো শরিয়তের লক্ষ্য হিসেবে জীবন রক্ষা, দ্বীন রক্ষা, আকল রক্ষা, সন্তানদের রক্ষা এবং সম্পদ রক্ষার কথা বলেন। তিনিই প্রথম প্রয়োজনকে জরুরি খাত (একান্ত প্রয়োজন), হাজ্জিয়াত (হলে ভালো হয়) এবং তাহসিনিয়াত (সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক পণ্য বা সেবা) এ তিন ভাগে ভাগ করেন।
ইমাম শাতিবি তার লেখায় মাকাসিদ বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি তার বিখ্যাত বই আল মুয়াফিকাতে এ সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসলামি আইন বা শরিয়তকে দেয়া হয়েছে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য।
ইমাম শাতিবি শরিয়তদাতা কী উদ্দেশ্যে আইন দিয়েছেন তা অনুসন্ধান করার ওপর গুরুত্ব দেন। এটা করাকে ‘তালিল’ বলা হয়। এর মাধ্যমেই আইনের পর্যালোচনা করে শরিয়াহর উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়, যা ইমাম শাতিবি করেছেন।
মাকাসিদ আল শরিয়াহর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট কাজ করেছেন মুহাম্মদ আল তাহির ইবনুল আসুর। তিনি ১৯৭৯ সালে তিউনিসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া শেষ করে বিচারক এবং পরে দেশের সাইখুল ইসলাম হন। তিনি শিক্ষা ও ইসলামি আইনের সংস্কার ও প্রসারে অনেক কাজ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি মাকাসিদ আল শরিয়াহর ওপর পুস্তক লেখেন।
তিনি প্রথম অধ্যায়ে বলেন যে, শরিয়াহ আইন অবশ্যই কতগুলো মহৎ উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তিশীল। আল্লাহ তায়ালা কিছু উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই আইন দিয়েছেন। ফিকাহবিদদের দায়িত্ব এসব উদ্দেশ্য বোঝা। কুরআনের আইনের উদ্দেশ্যের জন্য ‘তালিল’ বা কারণ অনুসন্ধান করার কথা ইমাম শাতিবি বলেছেন। ইবনুল আসুর রাসূল সা:-এর কাজ ও বক্তব্যের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করার কথা বলেছেন। সাহাবিরা (রা:) রাসূলের নবী ও আইনদাতা হিসেবে দেয়া বক্তব্যের সাথে অন্য বক্তব্যের পার্থক্য করতেন। ফিকাহবিদদের দায়িত্ব এ পার্থক্য করা এবং রাসূল সা:-এর কাজের পরিপ্রেক্ষিত ও উপলক্ষ বিবেচনা করা।
ইবনুল আসুর তারপর শরিয়াহর উদ্দেশ্য একে একে বর্ণনা করেনÑ (১) সহজতা বিধান করা শরিয়াহর প্রধান উদ্দেশ্য। কাজেই নতুন আইন প্রণয়নে এ দিকে খেয়াল রাখতে হবে। (২) ফিতরাহকে রক্ষা করতে হবে। ফিতরাহ হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব (রহঃৎরহংরপ হধঃঁৎব)। এর ওপরই আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আইনকে ফিতরাহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। (৩) শরিয়াহর আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে মহানুভবতা। এটি হতে হবে পারস্পরিক সম্পদের ভিত্তি। (৪) সমাজ থেকে অনাচার দূর করা শরিয়াহর অন্যতম উদ্দেশ্য। (৫) সমাজে মাসলাহা বা জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা শরিয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। নতুন আইন প্রণয়নে এটি প্রধান ভিত্তি হতে পারে। (৬) মাফাসাদা বা অকল্যাণ দূর করা শরিয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। আইন প্রণয়নে এ বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়া উচিত। (৭) ইসলামি শরিয়াহ বিশ্বজনীন। আল্লাহ মানুষদের সবাইকে খলিফা করেছেন ও সম্মানিত করেছেন। এর দাবি হচ্ছে, যতটুকু সম্ভব সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা। শরিয়াহ সমতা চাপিয়ে দেয় না, কিন্তু আইন প্রণয়নে খেয়াল রাখতে হবে, যেন সুবিধাপ্রাপ্তরা আরো সুবিধা না পেয়ে যায়। (৮) শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলাও শরিয়াহর লক্ষ্য। এটা না হলে মানুষের নিরাপত্তার বিঘœ হবে।
এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য ইবনুল আসুরের বইটি সবারই পড়া উচিত (iiit.org /publication/books in brief/ IbnulAshur)।
মাকাসিদ আল শরিয়াহ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উসুলুল ফিকাহতে এটি আরো গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উসুলুল ফিকাহতে মাকাসিদ আল শরিয়াহর ওপর একটি অধ্যায় হতে হবে। ইজতিহাদি আইনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মাকাসিদ আল শরিয়াহ। বিষয়টির দিকে সব ইসলামি পণ্ডিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার –
শুরুর দিকে ইসলামি আইন প্রণয়ন বিজ্ঞানে (উসুলুল ফিকাহতে) মাকাসিদের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো ছিল না। আল জু আইসি এবং ইমাম গাজ্জালী উসুলুল ফিকাহয় মাকাসিদ আল শরিয়াহকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। আল জু আইসি প্রথমবারের মতো শরিয়তের লক্ষ্য হিসেবে জীবন রক্ষা, দ্বীন রক্ষা, আকল রক্ষা, সন্তানদের রক্ষা এবং সম্পদ রক্ষার কথা বলেন। তিনিই প্রথম প্রয়োজনকে জরুরি খাত (একান্ত প্রয়োজন), হাজ্জিয়াত (হলে ভালো হয়) এবং তাহসিনিয়াত (সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক পণ্য বা সেবা) এ তিন ভাগে ভাগ করেন।
ইমাম শাতিবি তার লেখায় মাকাসিদ বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি তার বিখ্যাত বই আল মুয়াফিকাতে এ সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসলামি আইন বা শরিয়তকে দেয়া হয়েছে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য।
ইমাম শাতিবি শরিয়তদাতা কী উদ্দেশ্যে আইন দিয়েছেন তা অনুসন্ধান করার ওপর গুরুত্ব দেন। এটা করাকে ‘তালিল’ বলা হয়। এর মাধ্যমেই আইনের পর্যালোচনা করে শরিয়াহর উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়, যা ইমাম শাতিবি করেছেন।
মাকাসিদ আল শরিয়াহর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট কাজ করেছেন মুহাম্মদ আল তাহির ইবনুল আসুর। তিনি ১৯৭৯ সালে তিউনিসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া শেষ করে বিচারক এবং পরে দেশের সাইখুল ইসলাম হন। তিনি শিক্ষা ও ইসলামি আইনের সংস্কার ও প্রসারে অনেক কাজ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি মাকাসিদ আল শরিয়াহর ওপর পুস্তক লেখেন।
তিনি প্রথম অধ্যায়ে বলেন যে, শরিয়াহ আইন অবশ্যই কতগুলো মহৎ উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তিশীল। আল্লাহ তায়ালা কিছু উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই আইন দিয়েছেন। ফিকাহবিদদের দায়িত্ব এসব উদ্দেশ্য বোঝা। কুরআনের আইনের উদ্দেশ্যের জন্য ‘তালিল’ বা কারণ অনুসন্ধান করার কথা ইমাম শাতিবি বলেছেন। ইবনুল আসুর রাসূল সা:-এর কাজ ও বক্তব্যের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করার কথা বলেছেন। সাহাবিরা (রা:) রাসূলের নবী ও আইনদাতা হিসেবে দেয়া বক্তব্যের সাথে অন্য বক্তব্যের পার্থক্য করতেন। ফিকাহবিদদের দায়িত্ব এ পার্থক্য করা এবং রাসূল সা:-এর কাজের পরিপ্রেক্ষিত ও উপলক্ষ বিবেচনা করা।
ইবনুল আসুর তারপর শরিয়াহর উদ্দেশ্য একে একে বর্ণনা করেনÑ (১) সহজতা বিধান করা শরিয়াহর প্রধান উদ্দেশ্য। কাজেই নতুন আইন প্রণয়নে এ দিকে খেয়াল রাখতে হবে। (২) ফিতরাহকে রক্ষা করতে হবে। ফিতরাহ হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব (রহঃৎরহংরপ হধঃঁৎব)। এর ওপরই আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আইনকে ফিতরাহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। (৩) শরিয়াহর আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে মহানুভবতা। এটি হতে হবে পারস্পরিক সম্পদের ভিত্তি। (৪) সমাজ থেকে অনাচার দূর করা শরিয়াহর অন্যতম উদ্দেশ্য। (৫) সমাজে মাসলাহা বা জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা শরিয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। নতুন আইন প্রণয়নে এটি প্রধান ভিত্তি হতে পারে। (৬) মাফাসাদা বা অকল্যাণ দূর করা শরিয়াহর অন্যতম লক্ষ্য। আইন প্রণয়নে এ বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়া উচিত। (৭) ইসলামি শরিয়াহ বিশ্বজনীন। আল্লাহ মানুষদের সবাইকে খলিফা করেছেন ও সম্মানিত করেছেন। এর দাবি হচ্ছে, যতটুকু সম্ভব সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা। শরিয়াহ সমতা চাপিয়ে দেয় না, কিন্তু আইন প্রণয়নে খেয়াল রাখতে হবে, যেন সুবিধাপ্রাপ্তরা আরো সুবিধা না পেয়ে যায়। (৮) শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলাও শরিয়াহর লক্ষ্য। এটা না হলে মানুষের নিরাপত্তার বিঘœ হবে।
এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য ইবনুল আসুরের বইটি সবারই পড়া উচিত (iiit.org /publication/books in brief/ IbnulAshur)।
মাকাসিদ আল শরিয়াহ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উসুলুল ফিকাহতে এটি আরো গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উসুলুল ফিকাহতে মাকাসিদ আল শরিয়াহর ওপর একটি অধ্যায় হতে হবে। ইজতিহাদি আইনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মাকাসিদ আল শরিয়াহ। বিষয়টির দিকে সব ইসলামি পণ্ডিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার –

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন